মস্কোভস্কি ভকজাল
দেখতে দেখতে সময় যে কোথায় দিয়ে চলে গেল! ব্রীজগুলো ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। মানুষ
ফিরে যাচ্ছে যে যার গন্তব্যে। দস্তয়েভস্কির নায়ক নায়িকাদের মত বাস্তবের নায়ক নায়িকারাও
ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল আধো আলো আধো আঁধারে। অভি এখনও তাকিয়ে আছে নেভার দিকে।
তাকিয়ে দেখছে ব্রীজগুলো। ওর
মনে পড়বে লেজেন্ডারি বিমানচালক ভ্যালেরি কচালভের জীবনী নিয়ে তৈরি ফিল্মের কথা। সেখানে তিনি নেভার উপরে ত্রৈতস্কি সেতুর, যা সে সময় রাভেনস্তভা সেতু নামে বিখ্যাত ছিল, নীচ দিয়ে বিমান চালিয়ে চলে গেছিলেন তাঁর প্রেমিকা ওলগা এরাজমভনার মন জয় করার জন্য। যদিও এর সত্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে তবে সত্যই হোক আর
মিথ্যাই হোক এটা যে খুবই রোম্যান্টিক একটা কাহিনী সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
- কী ভাবছ?
নাস্তিয়ার এ প্রশ্ন শুনে অভি যেন বাস্তবে ফিরে এল। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
- ভাবছি এই রাত যদি কখনোই শেষ না হত!
- কী হত তাহলে?
- তুমিই বল।
- নানা,
তুমিই বল।
অভিকে কিছুই বলতে হল না। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে নাস্তিয়া সব বুঝতে নিল। যেন ও দুটি চোখেই সব লেখা ছিল।
এত দিন তুমি কোথায় ছিলে? মনে হচ্ছে আমি
যেন সারা জীবন এ রাতটার জন্যই অপেক্ষা করে ছিলাম।
নেভা নদীর ধারে ওরা এখন মাত্র দুটো প্রানী। শুধু নেভা নদী কেন, গোটা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে ওরা ছাড়া তখন আর কেউই ছিল না। অভি ওর গালে অনুভব করবে নাস্তিয়ার নিঃশ্বাসের গরম হাওয়া। হঠাৎ করেই ওরা দুজনে মিলেমিশে এক অভিন্ন স্বত্তায় পরিণত হবে।
পূর্ব দিগন্তে সূর্য আড়মোড়া দিতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। নাস্তিয়াকে জড়িয়ে ধরেই অভি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করে বলবে
সে অনেক দিন আগের কথা
এতই আগের যে মনে হয় অন্য জীবনে
অন্য দেশে .......
অপ্সরা আর কিন্নরদের মতো
আমরা তখন বাস করতাম স্বর্গ রাজ্যে
সেই স্বর্গে কোনো এক সন্ধ্যায়
যখন রুপালি চাঁদটা ভাসতে ভাসতে
হঠাৎ আটকে গেছিলো
শরতের সোনারঙা বার্চের মাথায়
তুমি বললে, যদি বলতে পারো
শুক্লপক্ষ
এটা না কৃষ্ণপক্ষ
একটা চুমু খাবো ......
সেই প্রথম তুমি আমাকে তুমি বলে ডাকলে
এতটাই হচকে গেছিলাম যে উত্তরটা আর দেয়া হয়নি .......
আমি তোমার চোখে খুঁজতাম নিজের ছবি
পড়তে চাইতাম মন আর
দেখতে চাইতাম তোমার মনের আয়নায়
প্রতিচ্ছবি
পরে কিনা আমার ভালোবাসার
কিন্তু সামনে এসে দাঁড়ালেই তুমি বন্ধ করতে দু চোখ,
তাই তোমার চোখে আমার ছবি আমি কখনো খুঁজতেই পারিনি
আজ আমরা দুই ভিন গ্রহের বাসিন্দা
যাদের মধ্যে কাজ করে না কোনো টেলিফোন
কিংবা ম্যাসেন্জার, স্কাইপে বা ফেসবুক
কে জানে, হয়তো মৃত্যুও মানুষকে এত দূরে সরায় না
তবুও আজও হঠাৎই আকাশের নীলে, সাগরের ঢেউয়ে
বনের গভীরে বা বাতাসের ঘূর্ণিতে দেখি
তোমার সেই হাসি, আর অপেক্ষা করি, এইতো বলবে,
বলতো আজ শুক্লপক্ষ না কৃষ্ণপক্ষ?
- তোমার অপেক্ষার শেষ কবে হবে কে জানে? দিনের বেলায়
তো আর চাঁদ দেখা যাবে না।
- তা যা বলেছ।
- তোমার মনে আছে খ্রিস্টের গল্প? পিটারকে বলেছিলেন
তিন বার মোরগ ডাকার পর তিনি জেসাসকে অস্বীকার করবেন। রাত পোহালে দস্তয়েভস্কিও কিন্তু
বেমালুম হারিয়ে যান। তাহলে কি তুমি হোটেলে ফিরে যাবে নাকি আমার বাসায়?
- দুটোর একটাতেও নয়।
- মানে?
- মস্কোভস্কি ভকজালে যাব।
- সেখানে আবার কী হারালে?
- গুলিয়া আসবে মস্কো থেকে। ওকে মিট করতে হবে।
- গুলিয়া, মানে তোমার বউ।
- হুম।
- তাহলে আমি তো যেতে পারব না।
- কেন?
- এসব তুমি বুঝবে না।
- আচ্ছা বলত, আমার তো ভালোবাসার কোন অভাব নেই। তোমরা দুজন কেন হাজার হাজার মানুষকে
ভালবাসলেও আমার ভালবাসা ফুরোবে না। অথচ তোমরা কখনই এই ভাগবাটোয়ারার মধ্যে না এসে থাকতে
পার না কেন?
- এই যে পারি না এখানেই আমরা নারীরা অনন্যা।
- যাকগে, আমি তো এখানকার রাস্তাঘাট চিনি না, আমাকে অন্তত সেখানে পৌঁছে দিও।
- তা দেব। তবে ট্রেন আসার দশ মিনিট আগে চলে যাব।
- মানে তুমি গুলিয়ার সাথে পরিচিত হতে চাও না?
- আমি সেটা বলছি না। পরে। এখন যদি আলাপ করিয়ে দিতে চাও তাতে আলাপ তো হবেই না, উল্টো স্ক্যাণ্ডাল
হবে। তুমি মেয়েদের চেন না।
এরপর ওরা রওনা হবে মস্কোভস্কি ভকজালের পথে। এখান থেকেই ১৯১৮ সালে লেনিন পিতেরবুরগ থেকে
রাজধানী মস্কোয় স্তানান্তরিত করেছিলেন। এই মস্কোভস্কি ভকজাল বা রেলওয়ে স্টেশন পিতেরবুরগের
সাথে মস্কোর সংযোগ ঘটায়। আর মস্কোয় সেই স্টেশনটির নাম লেনিনগ্রাদস্কি ভকজাল। ১৯৯১ সালে
নামটি আর পরিবর্তন করা হয়নি। গুরুত্বের দিক থেকে মস্কোভস্কি ভকজাল এগিয়ে থাকলেও এটা
পিতেরবুরগ বা রাশিয়ার প্রথম ভকজাল নয়। রাশিয়ার প্রথম ভকজালের নাম ভিতেভস্কি যা ১৮৩৭
সালে সাঙ্কত-পিতেরবুরগস্কি ভকজাল নাম নিয়ে আলোর মুখ দেখে। এই প্রথম রেললাইন সাঙ্কত-পিতেরবুরগের
সাথে তসারস্কোয়ে সেলোর সংযোগ রক্ষা করার জন্য তৈরি। এরপর বিভিন্ন সময় এর নাম পরিবর্তিত
হয়, তবে ১৯৩৫ সালে থেকে ভিতেভস্কি ভকজাল নামেই পরিচিত।
ইতিমধ্যে শহর জেগে উঠেছে। ভকজালের সামনে বাবুশাকারা ফুল বিক্রি শুরু করেছেন। অভি এক
বাবুশকার কাছ থেকে একটা ফুলের তোড়া কিনে নাস্তিয়াকে দিল।
- এত চমৎকার একটা রাতের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
- আবার এসো।
নাস্তিয়া ঘড়ি দেখতে শুরু করেছে। আর মাত্র মিনিট পনের পরে মস্কোর ট্রেন আসবে।
- শোন, আমি এখন যাই। দেখা হবে।
- যাই বলতে নেই। বল আসি।
- ঠিক আছে। আমি আসি।
এই বলে অভিকে আলতো করে চুমু দিয়ে নাস্তিয়া বেরিয়ে গেল। অভি গেল ওর পেছন পেছন, যদিও
জানে নাস্তিয়া আর ফিরেও তাকাবে না। অভি এবার আরেক তোড়া ফুল কিনে দাঁড়িয়ে রইলো গুলিয়ার
অপেক্ষায়। কিন্তু কোথায় গুলিয়া? স্টেশন লোকে
লোকারণ্য। বন্দীদের ভিড়। সাথে তাদের আত্মীয় স্বজন। কারও হাতে হাতকড়া, কারও পায়ে বেড়ি।
একটু একটু করে অভি আবার ফিরে যাচ্ছে উনবিংশ শতাব্দীতে। হঠাৎ ওর চোখ পড়ল দ্মিত্রি কারামাজভের
উপর। ওকে পাঠানো হচ্ছে সাইবেরিয়ায়। ওর পেছন পেছন যাচ্ছে গ্রুশেঙ্কা। এই সেই সুন্দরী
নারী যার জন্য দ্মিত্রি আর তার পিতা ফিওদর কারামাজভের মধ্য বাকবিতণ্ডা। সুযোগ বুঝে
স্মেরদিয়াকভ বুড়োকে খুন করে সব দোষ চাপিয়েছিল দ্মিত্রির কাঁধে। সে এখন সাইবেরিয়া যাচ্ছে
সাজা বহন করতে। ইভান আর আলিওশা এসেছে বড় ভাইকে বিদায় জানাতে। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য।
অভি আর পারছেনা নিতে। ঠিক তখনই যেন পর্দা উঠে যাবে। ট্রেন থেকে হাসতে হাসতে নামবে গুলিয়া।
সোজা চলে আসবে অভির কাছে। অভি ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দেবে গুলিয়ার দিকে। আনন্দে আর সুখে
চিক চিক করে উঠবে গুলিয়ার চোখ। এক দীর্ঘ আলিঙ্গনে একে অন্যেকে আবদ্ধ করবে ওর। আবেগ
কেটে গেলে গুলিয়া জিজ্ঞেস করবে
- তুমি আমার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছ?
- সারা জীবন!

Comments
Post a Comment