নেভা নদীর ধারে
- আর কিছুক্ষণ পরেই ব্রীজগুলো খুলতে শুরু করবে। চল নদীর দিকে যাই।
বলেই নাস্তিয়া নদীর দিকে
হাঁটতে শুরু করল। ইতিমধ্যে নদীর ধারে ভিড় জমে গেছে। সবাই অপেক্ষা করছে ব্রীজ খোলার।
অভির মনে পড়বে মস্কোর কথা, ছাত্র জীবনের কথা যখন বিভিন্ন উৎসবে স্যালুট বা ফারার ওয়ার্ক
হত। ওরা বন্ধুরা মিলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত মিকলুখো মাকলায়া স্ট্রীটে ক্রেস্তের
ওখানে। অনেক কষ্টে একটা জায়গা খুঁজে ও ট্রিপড বসাল। এক সময়ে ধীরে ধীরে খুলে গেল ব্রীজ।
১৯৮০ সালে অভি কোলকাতার খিদিরপুর ডকে গিয়েছিল এই ব্রীজ খোলা দেখতে। তবে পিতেরের এই
ব্যাপারটার মজাই আলাদা। যাকে বলে দর্শনীয় ব্যাপার। একের পর এক শিপ যাচ্ছে ব্রীজের সেই
খোলা জায়গাটুকু দিয়ে। নেভা এখন আলোয় আলোময়। বড় বড় শিপের বাইরেও অনেক ছোট ছোট নৌকা নেভার
বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে ট্যুরিস্টদের নিয়ে। লোকজন ছবি তুলছে। কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে নদীর ধার
ধরে। ওপারে ঝলমল করছে কুন্সকামেরা। এক কথায় এ যেন এক বিশাল শো। সোভিয়েত আমলে নেভার ধারে শ্বেত রাত্রি ছিলও আর দশটা রাতের মতই অনাড়ম্বর।
এখন পুঁজিবাদের কল্যাণে
সব কিছুকেই শোতে পরিণত হয়েছে। এতে খরচ হলেও লাভ কম নয়। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্যুরিস্ট
আসছে এসব দেখতে, পূর্ণ হচ্ছে শহরের কোষাগার, সাধারণ মানুষও এই সুযোগে দু পয়সা ইনকাম
করছে। বাজার অর্থনীতিতে সব কিছুই আজ পণ্য আর সব জায়গাই বাজার।
নেভা – কী অপূর্ব এক নাম। নাম শুনেই যেন রক্ত
টগবগ করে ফুটতে থাকে ধমনীতে। নেভা মানেই অরোরা, নেভা মানেই বিপ্লব, নেভা মানেই সমজতন্ত্রের জন্মের সময়ের গগনবিদারী চিৎকার। যদিও লম্বায় মাত্রই ৭৪ কিলোমিটার, ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের কল্যাণে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের আনাচে কানাচে। লাদঝস্কয়ে লেক থেকে বেরিয়ে আসা একমাত্র নদী এই নেভা শ্লিসসেলবুরগ, কিরোভস্ক, অত্রাদনোয়ে আর সাঙ্কত পিতেরবুরগ এই চারটি শহরকে বিধৌত করে মিলিয়ে গেছে বাল্টিক সাগরের ফিন উপসাগরে। এছাড়াও নেভা ভোলগা-বাল্টিক এবং বেলামোর-বাল্টিক জলপথের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে যেহেতু পিতেরে সমুদ্র সমতল থেকে এই নদীর উচ্চতা মাত্র ৩ সেন্টিমিটার তাই সে প্রায় প্রতি বছরই পিতেরে বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাশিয়ার প্রায় সব নদীর মতই নেভাও বছরের বেশির ভাগ সময় বরফের কম্বল মুড়ি
দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে তাই এখানে জাহাজ চলাচল করতে পারে গরমের মাসগুলো। পিতেরবুরগ যখন স্থাপন করা হয় তখন নেভা শুধু এর যাতায়াতের/ যোগাযোগের অংশই ছিল না, ছিলও প্রতিরক্ষার অংশও। তাই তো এই ব্রীজের ব্যবস্থা যেগুলো রাতে তুলে রাখা যায় যাতে শত্রু অতর্কিতে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করতে না পারে।
ইতিমধ্যে নেভা অপূর্ব সাজে সজ্জিত। এর আগে সেই ১৯৮৯ সালে মাস্টার্স থিসিস ডিফেণ্ড করে অভি লেনিনগ্রাদ বেড়াতে এসেছিল বন্ধু দীপুর সাথে। দীপু এ শহরেই ভাষা কোর্স করেছিল। সেবার অভির অনেকটা সময় কেটেছে মেডিক্যালের হোস্টেলে। কিন্তু অভি দুদিনেই মস্কোর জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। কেন?
আসলে সেখানে ছিল যাকে বলে বিরামহীন আড্ডা। কিছুটা সময় একা কাটাতে না পারলে অভির যেন মাথা খারাপ হয়ে যায়। মস্কোয় যত আড্ডাই দিক, ও রুমে চলে আসত। লেনিনগ্রাদে সেটা হয়নি। যাহোক সেবার রাত কাটাতে ওরা গেছিল অরোরার ওখানে। তখন ওরা বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত। মনে হয় সে জন্যেই। সেই রাতে হঠাৎ কোথা থেকে যেন নাস্তেঙ্কা এসে হাজির। একদিকে ওর পুরান প্রেমিককে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে নতুন ভালোবাসার মানুষের আবির্ভাব ওর জীবনে। ঠিক যখন ও নতুন করে জীবন গড়বে ভাবছে, অপেক্ষার ইতি ঘটিয়ে মঞ্চে আসে পুরনো প্রেমিক। ওরা যেন অভির সাথে দেখা করতেই সেবার অরোরার আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। তবে এখন আর সেদিন নেই। তখনকার শান্ত শ্বেত রাত্রের জায়গা নিয়েছে উৎসব মুখর রাত। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। সমস্ত নেভা যেন এক আলোর মেলা। দীপাবলি বা দেওয়ালির রাতে ওদের বাড়িঘর যেমন মোমবাতির আলোকে আলোকিত হয়ে উঠত, তেমনি ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের নৌকা, লঞ্চ আর শিপের আলোয় সেজে উঠেছে নেভা। নদীর ধারের আলো তো আছেই। বাজার অর্থনীতির যুগে সবই পণ্য, এমনকি সাদা রাতও। হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে আসে রাতের নেভা দেখতে। স্কারলেট বা লাল পাল তোলা জাহাজ দেখার জন্য পিতেরবুরগে ভিড় করে এ সময়ে। রাশিয়ায় তরুণ তরুণীরা স্কুল শেষ করে এখানে আসে স্বপ্নের মত এই নৌকায় নিজেদের স্বপ্নগুলো ভাসিয়ে দিতে। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে। আর সেই উৎসবের রেশ থাকে আরও অনেক দিন। ঠিক এমন সময় অভির পিতের আগমন। ও হাঁটছে আর ঠিক করছে কোথায় ট্রিপড সেট করা যায়। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে ইতিমধ্যেই ও বেশ কিছু ছবিও তুলেছে। এক জায়গায় দেখে অনেকে সিঁড়ি বেয়ে নেভা নদীতে নেমে যাচ্ছে। ভালো কিছু ছবির জন্য অভি সেদিকে পা বাড়াল। হঠাৎ এক বিদঘুটে লোক এসে বলল
- এবার যদি ধাক্কা দিয়ে তোমাকে নদীতে ফেলে দিই?
অভির প্রথমে মনে হয়েছিল মাতাল কেউ হবে। তবে জামাকাপড় দেখে অবাক হল। এখন তো এরকম পোশাক কেউ পরে না। তাহলে?
- বা রে। ধাক্কা দিতে চাইলেই হল? মগের মুল্লুক নাকি?
- মগের মুল্লুক হবে কেন? ইচ্ছে হচ্ছে, তাই ফেলে দেব।
- ইচ্ছে হলেই সব করা যায়?
- যাবে না কেন? কোন মানা তো নেই।
- মানা নেই বলেই করা যাবে?
- ইভান ফিওদরভিচ বলেন “স্তো নি জাপ্রেশেনো, তো ই রাজরেশেনো”, বুঝলে “যদি কোন কিছু করায় বাঁধা না থাকে সেটা করা যায়।”
অভি আঁতকে উঠল। তার সাথে স্মেরদিয়াকভ কথা বলছে। সর্বনাশ। এই লোকই তো বুড়ো কারামাজভকে খুন করেছিল। এর না আছে নীতি, না আছে বিবেক। এখন উপায়? হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে দেখা গেল এই গরমেও মাথায় সিলিন্ডার পরে চুরুট হাতে একজন ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ইভান
ফিওদরোভিচ! অভি আত্মায় যেন জল ফিরে এল। সাহস করে সে বলল,
- যুগ বদলে গেছে। তোমার যুগের নিয়ম এ যুগে কাজ করে না। বিশ্বাস না হয় ইভান
ফিওদরোভিচকে জিজ্ঞেস কর। ঐ যে উনি দাঁড়িয়ে আমাদের দিকেই তাকিয়ে দেখছেন।
স্মেরদিয়াকভ ঘাড় ঘুরিয়ে
ইভান কারামাজভকে দেখে ভয়ে চুপসে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল চোখের
সামনে থেকে। ইভান কারামাজভও ইতিমধ্যেই হারিয়ে গেলেন মানুষের ভিড়ে।

Comments
Post a Comment