ট্রেন টু সাঙ্কত পিতেরসবুরগ

 

অভির মনে পড়ল গত রাতের ঘটনা। মস্কো থেকে পিতের আসছিলো ট্রেনে করে। যে বগিতে আসছিলো সেখানেই দেখা এক ভদ্রলোকের সাথে। অভি অবশ্য তখন শিওর ছিল না তাঁকে ভদ্রলোক বলা যায় কিনা। উদ্ভ্রান্তের মত চেহারা। ধুসর চোখ। আর অদ্ভুত সে চোখের দৃষ্টি। ক্যামেরা ফোকাস করতে না পারলে যেমন সবকিছু ঝাপসা দেখায় ওঁর চোখেও যেন তেমন কিছু একটা ছিল। অভির ছোটবেলায় এদের বলত পাগল। পাগল মানে যারা ভাংচুর করে ঠিক তা নয়, যারা ঠিক অন্যদের মত নয়, সব কাজে কর্মে এক ধরণের পাগলামি ভাব। অভি  নিজে খুব ভালো ভাবেই জানে এটা। ছোটবেলায় অনেকেই ওকেও পাগল বলেই ডাকত বা ভাবত। এদের এখনকার নাম মনে হয় অটিস্ট। সে যাই হোক, তাঁকে দেখে ভয়ের উদ্রেক না হলেও বিশ্বাসের উদ্রেক হচ্ছিল না। ভাগ্যিস ওরা এক কামরায় যাচ্ছে না। উনি দাঁড়িয়ে ছিলেন করিডোরের অন্য প্রান্তে। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন দ্রুত গতিতে পিছিয়ে যাওয়া লাইট-পোস্টগুলো আর মাঝে মাঝে অভির দিকে তাকাচ্ছিলেন। অভি ঠিক যখন ভাবছিল এগিয়ে গিয়ে ওঁর সাথে কথা বলবে ঠিক সে সময়ই আরেকজন বেরিয়ে এসে ওঁর পাশে দাঁড়ালো। দেখেই বোঝা যায় ওরা পূর্ব পরিচিত। তবে আগন্তুক  আগের জনের মত শান্ত নয়। লাল দুটো চোখ থেকে যেন আগুন বেরুচ্ছে। চেহারায় তার আক্রমণাত্মক ভাব। সো দেখে অভি আর দেরি না করে নিজের কামরায় ঢুকে গেল।

আচ্ছা গতকালের ট্রেনের দুই দু’জন মিশকিন আর রাগঝিন নয়তো?

মিশকিন আর রাগঝিন – দস্তয়েভস্কির ইডিয়ট উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্র। অনেকের ধারণা ফিওদর মিখাইলভিচ দস্তয়েভস্কি যীশু খৃস্টের আদলে মিশকিনের চরিত্র তৈরি করেছেন। রাগঝিনের সাথে তাঁর পরিচয় ইউরোপ থেকে ফেরার পথে ট্রেনে। দু’জনেই দীর্ঘ দিন ইউরোপে কাটিয়ে রাশিয়া ফিরছিলেন। মিশকিন উত্তরাধিকার হিসেবে প্রাপ্ত সম্পত্তি বুঝে নিতে, রাগঝিন সাঙ্কত পিতেরবুরগের অন্যতম সুন্দরী আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনার সাথে দেখা করতে।  

হঠাৎ করেই কথাটা মাথায় আসতে কেঁপে উঠলো। সে কী করে সম্ভব। এই একবিংশ শতাব্দীতে ওরা আসবে কোত্থেকে। তাও আবার মস্কো পিতেরের বিলাশবহুল ট্রেনে। অভি নিজেকে চিমটি কাটল। হ্যাঁ, ব্যথা লাগছে। চোখ কচলালো। মিটমিট করে এদিক সেদিক তাকিয়ে বুঝল চোখের কোন সমস্যা নেই। কী হচ্ছে এসব? কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?  না না, তা হবে কেন। পিতেরে এসেছে একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে। এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে নেভস্কি প্রস্পেক্টের আশেপাশে। কিছুক্ষণ ছবি তুলে যাবে শীত প্রাসাদের ওদিকে। নাস্তিয়া ওর জন্যে অপেক্ষা করবে। নাস্তিয়া মস্কোর মেয়ে। অভির এক ইয়ার নীচে পড়ত। একই সুপারভাইজার ছিল ওদের দুজনের। তবে ছাত্র জীবনে তেমন ওঠাবসা ছিল না। অনেক আগেই ফিজিক্স ছেড়ে বিজনেস লাইনে চলে গেছে। তবে ওদের বসের জন্মদিনে বা ইউনিভার্সিটির অনুষ্ঠানে আসে, দেখা হয়, কথা হয়। বর্তমানে পিতেরে থাকে। তাই আসার আগে অভি ওর সাথে যোগাযোগ করেছে। কথা হয়েছে আজ ওরা একসাথে কোথাও ডিনার করবে তারপর নাস্তিয়া ওকে দেখাবে রাতের পিতের। ব্রীজ উঠিয়ে জাহাজ চলাচলের দৃশ্যআরও অনেক কিছু। সব যখন শেষ হবে তখন ভোরের দিকে অভিকে পৌঁছে দেবে হোটেলে।  ছবি তোলা অভির অন্যতম প্রধান হবি। কনফারেন্স বাদে রাতের পিতারের ছবি তোলা ওর এদিকে আসার প্রধান কারণ। তাই অভি আবার নিজেকে চিমটি কেটে মিশকিন, রাগঝিনদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল শীত প্রাসাদের দিকে। 

 


 

 

Comments

Popular posts from this blog

নেভা নদীর ধারে

স্তারেতস জশিমা