পিওতর দ্য গ্রেট

 


ইসাকিয়েভস্কি সাবর থেকে হাঁটতে হাঁটতে ওর চলল পিওতর দ্য গ্রেটের স্ট্যাচুর কাছে। ঘোড়ার পিঠে বসে আছেতিনি। ঘোড়ার পায়ের নীচে বিশাল এক সাপ। রাতের আলোয় পিওতরকে  একেবারে অন্যরকম লাগছে। অভি চারিদিকে তাকিয়ে দেখছে কিসের ছবি তোলা যায়। আর নাস্তিয়া পাশে হাঁটতে হাঁটতে ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করছিল। গল্পের এক পর্যায়ে নাস্তিয়া জিজ্ঞেস করল

 - তোমার কাতিয়ার কথা মনে আছে?
-
কোন কাতিয়া?
-
কেন, তোমাদের সাথে রসায়নে পড়ত। কালো চুলের সেই মেয়েটা।

নাস্তিয়ার কথায় ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল ছাত্রজীবনের দিনগুলি। অভি ফিরে গেল ভার্সিটির প্রথম বর্ষে। র মনে পড়ল একসাথে স্কী করার কথা। সেটা ১৯৮৪ সালের শীত। ওরা গেছে স্কী করতে। হোস্টেলের পেছনে বনের ভেতর দিয়ে গিয়ে লেক পরিক্রম করে ওরা ফিরছে স্টেডিয়ামে। অভি সবে মাত্র স্কী করতে শিখছে। একটু এগুলেই পায়ে পা জড়িয়ে পড়ছে, পড়তে পড়তে কোন রকমে সামলে নিচ্ছে নিজেকে। ওর পাশ দিয়ে একের পর এক বেরিয়ে যাচ্ছে ওর রুশ ইয়ারমেটরা। অভিকে এ অবস্থায় দেখে কাতিয়া এগিয়ে এল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে। সবাই চলে গেলে কাতিয়া একা রয়ে গেল অভির সাথে।  
- তুমি কে?
- আমি অভি।
- না না, আমি জানতে চাইছি তুমি কোন সাবজেক্টে পড়বে, হেসে বলল কাতিয়া।   
- পদার্থবিদ্যায়।
একটু একটু করে অনেক কথাই বলল অভি ওর ভাঙ্গা রুশ ভাষায়। ওর কালো চুল, কালো চোখ অভির মনে এক গভীর ছাপ রেখে গেল।
কালো চুলের সেই ককেসাসের মেয়েটাকে দেখলেই ওর বুকের ভেতর কী একটা তরঙ্গ খেলে যেত। একদিন রুমমেট ঝেনিয়াকে কাতিয়ার প্রতি ওর দুর্বলতার কথা বলায় বলল
-
ওদিকে না তাকানোই ভাল। অযথা কষ্ট পাবি।
-
কেন?
-
এরা সোভিয়েত ইউনিয়নের উঁচু তলার লোক।
-
তোদের না শ্রেণীহীন সমাজ।
-
সেটা মুখে মুখেই।
-
কিন্তু কাতিয়ার সাথে এর সম্পর্ক কি?
-
হল স্পারতাকের অন্যতম কর্মকর্তা নিকোলাই স্তারসতিনের নাতনি।
-
কিন্ত ওকে দেখে তো ককেসাসের বলে মনে হয়।
-
ওর বাবা ওই অঞ্চলের লোক। যাকগে, তার চেয়েও বড় কথা সেরগেই কারালিওভের নাতির সাথে ওর সম্পর্ক। কিছুদিন পরেই ওদের বিয়ে হবে বলে শুনেছি।
অভি আর কোন কথা বলেনি। কিছুদিন পরে কাতিয়া সত্যি সত্যিই অন্য কোথাও চলে যায়। মনে মনে এক দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে অভি যখন পৃথিবীতে নেমে এল, একটু লাজুক কণ্ঠে নাস্তিয়াকে বলল
-
ঠিক জানি না। আদনাক্লাসনিকিতে একবার ওকে দেখেছিলাম। ছবি দেখে মনে হল অনেক সন্তানের মা। এর বেশি  কিছু জানি না।
নাস্তিয়ার দুষ্টুমিতে ভরা চোখ দেখে অভি বুঝল ঝেনিয়া কাতিয়ার প্রতি ওর দুর্বলতার কথা গোপন রাখেনি।

 

পিওতর দ্য গ্রেটের এই ভাস্কর্যের নাম ব্রোঞ্জের অশ্বারোহী। ঘোড়সওয়ার পিতের যেন নেভা নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন। ভাস্কর এতেন ফালকোনে ১৭৬৮ – ১৭৭০ এই দু’ বছরে পিতরের মডেল তৈরি করেন। কাজটি সম্পন্ন করতে তাঁকে সাহায্য মেরি আন কল্লো আর ফিওদর গরদেয়েভ। ১০. মিটার উঁচু এ মূর্তির উন্মোচন হয়   ১৭৮২ সালে। এতে খোঁদাই করে লেখা আছে “প্রথম পিতরকে দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনা।“ এটা এক সময় ছিল পিতেরবুরগের সিম্বল মত। বিভিন্ন সময়ে রুশ কয়েনে ব্রোঞ্জের অশ্বারোহী শোভা পেয়েছে।  এর মধ্যে ১৯৯০ সালে রুশ সাম্রাজ্যের ৫০০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ১০০ রুবলের সোনার মুদ্রা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৯৪ ও ২০০৩ রাশিয়ার মুদ্রায় এই ভাস্কর্য স্থান পায়। এর বাইরেও জার  রাশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নতুন রাশিয়ার বিভিন্ন ডাক টিকেটে স্থান করে নিয়েছে ব্রোঞ্জের অশ্বারোহী। এর আগে যে তিনবার অভি লেনিনগ্রাদ বা পিতেরে এসেছে, সব বারই  এখানে ঘুরে গেছে। এই রাতে উজ্জ্বল আলোতে ঝলসে যাওয়া পিতরের সামনে দাঁড়িয়ে অভি সেসব দিনের কথা ভাবছিল আর ওর চোখের সামনে ভাসছিল ছাত্র জীবনের বন্ধুদের মুখ। মাঝে মাঝে নাস্তিয়ার কথা ভেসে আসছিল অভির কানে। তবে নাস্তিয়া ঠিক কি যে বলছিল ও বুঝতে পারছিল না। বাইরে থেকে অবশ্য যে কেউ ভাবতে পারে অভি এক নিবিষ্ট মনে ছবি তুলছে। হ্যাঁ, ও প্রায়ই ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রাখছিল, মাঝে মধ্যে দু একটা ছবিও তুলছিল, তবে প্রায়ই কেন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল। কেন? হঠাৎ নাস্তিয়া কাতিয়ার কথা বলায়, নাকি লেনিনগ্রাদের অতীত স্মৃতি মনে করে? অথবা অন্য কিছু ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল? ক্যামেরার একটা অসুবিধা হল ওর ভেতর দিয়ে অনেক কিছু স্পষ্ট দেখা যায়। আর যদি টেলি বা জুম লেন্স লাগানো থাকে, তবে তো কথাই নেই। এখন এখানে লোকের ভিড়। সবাই এদিকে এসে ভিড় করছে ব্রীজ খোলা দেখবে বলে। এটা গ্রীষ্মের পিতেরের এক অনন্য আকর্ষণ। শ্বেত রাতে ঘুরে বেড়ানো, আর নেভা নদীর বুক বেয়ে ফিনস্কি জালিব থেকে লাদঝস্কয়ে ওজেরা পর্যন্ত ছোট বড় বিভিন্ন মাপের জাহাজের চলাচল করার দৃশ্য। অনেকেই এ সময় বিভিন্ন মাপের বোট ভাড়া করে নদী থেকে এসব দৃশ্য দেখে। আবার নদীর দু’ ধারেও ভিড় জমায় অগণিত মানুষ। নদীর ধারে শত শত মুখ আর মনের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ভিড়ে হঠাৎ অভির চোখে পড়ে একজন মানুষের ক্লান্ত মুখ। মনে হয় না তিনি এখানে আনন্দ ভ্রমণে এসেছেন। তাঁর দু’ চোখে উদ্ভ্রান্তের মত দৃষ্টি। মানুষ হঠাৎ সব কিছু হারালে যেমন হয়, ঠিক তেমনটা। কিন্তু এই মুখ অভির পরিচিত নয়, ও এ মুখ দেখেনি, কোন গল্পে এমন মুখের বর্ণনা পড়েনি। কে? কে হতে পারে এই লোক? এ যেন শাপমোচন নাটকে বসন্ত উৎসবে অপূর্ব সুন্দর মানুষদের মধ্যে কদাকার একজনের হঠাৎ আগমন। তাঁর উপস্থিতি যেন শ্বেত রাতের এই আনন্দ উৎসবের ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। অভি অনেক চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না, কেন যেন তার মানস চক্ষে বারবার ভেসে উঠছে এই মুখ। 
-
কি হয়েছে?          
-
কই, কিছু হয়নি তো।      
-
হয়েছে। আমি তো বুঝতে পারছি। কিছু দেখেছ?
-
হ্যাঁ, খুব পরিচিত একটা মুখ তবে মনে করতে পারছি না কোথায় দেখেছি।
-
পেরভের কথা মনে আছে? 
-
উনিশ শতকের রুশ শিল্পী?   
-
হ্যাঁ। তাঁর কোন ছবি? দস্তয়েভস্কি?
-
হ্যাঁ, অনেকেই এখানে ওনাকে দেখতে পান। বিশেষ করে শ্বেত রাতে।
-
কিন্তু এখানে কেন?
-
পাশেই একটা ক্যাসিনো আছে।
-
বলতে চাও উনি এখানে খেলতে আসেন? হতে পারে। উনি তো নামকরা খেলোয়াড়। জীবন নিয়েই কি কম খেলেছেন?

অভির চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবুশকা, আলেক্সেই ইভানভিচ আর পলিনার মুখ। কখনও সে মুখ গুলো জেতার আনন্দে জ্বলজ্বল করছে, কখনও চুপসে যাচ্ছে হারার ব্যথায়। «জেরো, জেরো» - চিৎকার করে উঠছেন বাবুশকা। জীবন তার সত্যিই আজ শুধুই খেলা। এক রাতের এই বিরল অভিজ্ঞতায় অভিরও মনে হচ্ছে জীবনটা কিছু নয় শুধু খেলা আর খেলা। নাস্তিয়ার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেরে অভি তাকাবে সামনের দিকে।  একজন লোক ধীরে ধীরে আধা আলো আধা অন্ধকারে মিলিয়ে  যাবে  পিতারের সরু গলিতে।   





Comments

Popular posts from this blog

ট্রেন টু সাঙ্কত পিতেরসবুরগ

স্তারেতস জশিমা

ইসাকিয়েভস্কি সাবর