ইসাকিয়েভস্কি সাবর
রাতের আকাশে ঝলমল করছিল ইসাকিয়েভস্কি সাবর। অভি এদিক সেদিক ঘুরে জায়গা ঠিক করছিল কোত্থেকে ছবি তুলবে। এক সময়ে জায়গা ঠিক করে ও ট্রিপড বসাতে শুরু করল। নাস্তিয়া পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে শুরু করল।
এবার নিয়ে অভি চার বার পিতেরে এসেছে আর প্রতিবারই দেখেছে ইসাকিয়েভস্কি সাবরে মেরামতের কাজ চলছে। যার ফলে এখনও পর্যন্ত ও এই সাবরের ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
বর্তমান ইসাকিয়েভস্কি সাবর চতুর্থ স্থাপনা। প্রথম সাবর স্থাপিত হয় পিতর পিয়ারভি বা পিটার দ্য গ্রেটের আদেশে ১৭০৬ সালে ১০ হাজার লোকের শ্রমে আডমিরাল্টির শিপইয়ার্ডগুলির জন্য। এখানেই ১৭১২ সালে পিতর আর ইয়েকাতেরিনা আলেক্সেভনার বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই সাবরের স্থপতি ছিলেন হল্যান্ডের হেরমান ভন বলাস। এটা ছিল কাঠের তৈরি একতলা সাবর।
প্রথম সাবর দ্রুত নষ্ট হয়ে গেলে ১৭১৭ সালে দ্বিতীয় সাবর তৈরি করা হয়। এটা ছিল পাথরের সাবর। পিতর পিয়ারভি নিজ হাতে সবরের জন্য ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন আর এই নতুন সাবর ইসাকি দালমাতস্কির উৎসর্গ করেন। তখন থেকেই এই সাবর ইসাকিয়েভস্কি সাবর হিসেবে পরিচিত হয়।
১৭৬১ সালে সিনেট ইসাকিয়েভস্কি সাবর পুনর্নির্মাণের জন্য সাভা চেভানকিনকে আহ্বান জানিয়ে আদেশ জারি করে। তিনি সাবরের জন্য নতুন জায়গা নির্ধারণ করেন নদীর তীর থেকে বেশ দূরে। এখানেই বর্তমানের ইসাকিয়েভস্কি সাবর অবস্থিত। এই নির্মাণ কাজ শুরু হয় সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ইয়েকাতেরিনার শাসন কালে। তিনি মার্বেল পাথরের সাথে অন্য পাথর ব্যবহার করে নতুন সাবর তৈরি আদেশ দেন। কাজ শুরু হয় ১৭৬৮ সালে। ১৮০২ সালে নির্মাণ কার্য শেষ হয়। কিন্তু তার আগেই সাবর নিয়ে হাসাহাসি শুরু হয়ে যায়। ফলে তখনই এই সাবর নতুন করে তৈরির জন্য জনমত গড়ে উঠে।
১৮০৯ সালে নতুন সাবরের স্থাপত্যের জন্য প্রোজেক্ট আহ্বান করা হয়। সে সময়ের রাশিয়া ও ইউরোপের নামকরা স্থপতিরা এতে অংশ নেন, কিন্তু জার আলেক্সান্দর পিয়ারভি সব প্রোজেক্ট বাতিল করে দেন। জারের আহ্বানে অগুস্ট মনফেরান ১৮১৮ সালে নতুন সাবরের প্রোজেক্ট তৈরি করেন। ১৮১৯ সালে নতুন সাবরের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে মাঝখানে প্রোজেক্টে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। ১৮২৫ সালে মনফেরান পরিবর্তিত প্রোজেক্ট পেশ করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ১৮৫৮ সালে জার দ্বিতীয় আলেক্সান্দারের উপস্থিতিতে সাবরের স্যাঙ্কটিফিকেশন সম্পন্ন হয়। সোভিয়েত আমলে সাবর মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়।
অভি যখন ঘুরে ঘুরে রাতের সাবরের ছবি তুলছিল নাস্তিয়া ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছিল ইসাকিয়েভস্কি সাবরের ইতিহাস, তার জীবন বৃত্তান্ত। একবার ক্যামেরা থেকে চোখ তুলে অভি দেখবে নাস্তিয়া কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে। বয়স বছর কুড়ি হবে। ওর সোনালি চুল সাবরের আলোয় ঝলমল করছে। তবে ওর বিষণ্ণ নীল চোখ দুটি বলে দিচ্ছে ওর দুঃখের কথা, ওর হতাশার কথা। অভি যখন ভাবছে মেয়েটার কাছে গিয়ে জানতে চাইবে কী হয়েছে ঠিক তখনই ভুঁই ফুঁড়ে এক যুবক এসে হাজির হল মেয়েটির সামনে
- সোনিয়া, লক্ষ্মীটি তুমি আমার কথা শোন।
- কি শুনব বল। তুমি যা করেছ তারপরেও আমাকে বলছ তোমার কথা শুনতে, তোমাকে বিশ্বাস করতে?
- কিন্তু আমার কি অন্য কোন উপায় ছিল? এই বুড়ি আজ হোক, কাল হোক এমনিতেই মারা যেত। সে নিজে কখনই এই সম্পদ ভোগ করার সুযোগ পেত না। আমি তো ওর সব কিছু নিয়ে যাইনি। নিজের পড়াশুনার জন্য, নিজে মানুষের মত মানুষ হবার জন্য যেটুকু দরকার সেটা নিয়েছি। তা না হলে জীবনের শুরুতেই হয়তো আমাকে মরে যেতে হত। সেটা কি কম দুঃখজনক হত!
- তাই বলে একজন জলজ্যান্ত মানুষকে খুন করা? হয়তো তোমার উদ্দেশ্য সত্যি সত্যিই মহান, তাই বলে মানুষের জীবনের বিনিময়ে?
- দেখ, ৎসেল অপ্রাভদিভায়েত স্রেদস্তভা, লক্ষ্যই উপায়ের যৌক্তিকতা, তার ন্যায্যতা নির্ধারণ করে।
- হুম। কিন্তু এটা তো আমাদের জানার কথা নয়। সেটা বলেছিলেন স্ট্যালিন অনেক যুগ পরে।
- কিন্তু আমরা তো আর সেই যুগ পেরিয়ে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছি।
- তারপরেও, অন্যায় অন্যায়ই।
- আচ্ছা, মানুষ যখন যুদ্ধে নামে তখন কত লোক হত্যা করে। করতে হয়। তাকে কি খুনি বলবে যদি সে পরবর্তী কালে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। সে যদি শান্তিপ্রিয় নাগরিক হয়। ন্যায়ের পথে চলে দেশ ও দশের সেবা করে। আমি তো নিজেকে সে পথেই নিয়ে যেতে চাই, লেখাপড়া করে দেশের একজন সুনাগরিক হতে চাই।
এই বলে ছেলেটি হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল সোনিয়ার সামনে। সোনিয়া কিছু বলল না। মুখ ঘুরিয়ে সাবরের দিকে তাকিয়ে রইল। অভির আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে এর মধ্যেই বুঝে গেছে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাস্কলনিকভ আর সোনিয়া। তার মনে পড়ল সন্ধ্যার ঘটনা। তাই সে বলল
- না না, তুমি খুনি নও। সেই বুড়ি বেঁচে আছে। আমি তাঁকে আজ সন্ধ্যায়ই দেখেছি।
- কার সাথে কথা বলছ তুমি অভি?
রাস্কলনিকভ, সোনিয়া কেউ কোথাও ছিল না। ওর সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিল নাস্তিয়া। ও দুহাতে অভির মাথাটা ধরে নিজের বুকে টেনে নিল।
- তুমি খুব ক্লান্ত। বাসায় যাবে?
- না। চল নদীর দিকে যাই!
রাতের পিতের। আলো আঁধারে লুকিয়ে থাকা পিতের। এখানে সেখানে হাঁটছে লোকজন। নাস্তিয়া অভির হাতটা নিজের হাতে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল নেভা নদীর দিকে।

Comments
Post a Comment