নাস্তিয়া
- অভি তুমি এখানে? আমি তোমাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছি।
বলতে বলতে ক্যাফেতে ঢুকল নাস্তিয়া। নাস্তিয়া সেই আগের মতই আছে। হাসিখুশি। গাড় নীল চোখ। কোঁকড়ানো সোনালী চুল। ওরা ছিল দুই বোন। যমজ। ওর বোন পড়ত ফিললজি ফ্যাকাল্টিতে। মাঝে মধ্যে অভি ওর বোনকে নাস্তিয়া মনে করে ডেকে বোকা বনে যেত। ছাত্রজীবনে ওদের তেমন বন্ধুত্ব ছিল না। কথা হত মূলত কাজ নিয়ে মানে থিসিসের কাজ কেমন চলছে এসব ব্যাপারে। ব্যক্তিগত বিষয়ে কথাবার্তা হত না কখনও। এখন অনায়াসে নিজেদের কথা বলে, ছেলেমেয়েদের কথা বলে। যদি ছাত্রজীবনে নাস্তিয়াকে ডিনারে ডাকতে অভি সংকোচ বোধ করত, এখন সেটা করে না। যেকোনো পরিচিত প্রাক্তন ছাত্রের সাথে দেখা হওয়া মানে অতীতের সাথে সাক্ষাৎ। তখনকার শিক্ষকদের, সমবয়সী ছাত্রছাত্রী বন্ধুবান্ধবদের খবরাখবর আদানপ্রদান। তাই যখন সুযোগ আসে সেই সময়ের পরিচিত কারও সাথে দেখা করার, অভি সানন্দে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে।
নাস্তিয়া অভির ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল
- কী ব্যাপার। অন্য কারও জন্য অপেক্ষা করছিলে নাকি?
- না তো! কেন?
- তোমাকে দেখে কেমন যেন পাজল্ড মনে হচ্ছে।
- ও কিছু না।
- কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে। বলনা খুলে।
- তোমার এমন কখনও হয় যেন তুমি টাইম মেশিনে করে অতীতে চলে গেছ?
- বুঝেছি। আসলে পিতেরের পরিবেশ একেবারেই ভিন্ন। মস্কোর মত নয়। এখানকার রাস্তাঘাট, দোকানপাট, মানুষ সব আমাদের অতীতে নিয়ে যায়। তাছাড়া খেয়াল করলে দেখবে কত লোকজন এখানে আঠারো বা উনিশ শতকের পোশাক পরে ঘুরাফেরা করছে। এটাকে বলে ভিদেনিয়ে। স্বপ্ন নয় আবার বাস্তবও নয়। জেগে জেগেই তুমি নিজের দেখা বা পড়া কোন অতীত ঘটনার মাঝে গিয়ে উপস্থিত হও। বিশেষ করে শ্বেত রাত্রির দিনগুলোতে অনেকের সাথেই এমনটা ঘটে।
- বুঝেছি। তোমার সাথেও এমনটা ঘটে?
- হ্যাঁ।
- তাহলে আমার সাথে যদি এমনটা ঘটছে বুঝতে পার তবে সেটাকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করতে দিও।
ওরা হাঁটতে শুরু করল শ্বেত প্রাসাদের দিকে। ব্রীজ খোলার আগেই ওরা চলে যাবে ইসাকিয়েভস্কি সাবরের ওদিকে। সেখান থেকেই উপভোগ করবে রাতের পিতের।
অভি অবাক হয়ে খেয়াল করল ওদের কমন বন্ধুর সংখ্যা একেবারে কম নয়। অভি যে ফ্যাকাল্টিতে পড়ত, মানে ফিজ-ম্যাথে তিনটে সাবজেক্ট ছিল – পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও রসায়ন। কিছু কিছু ক্লাস – যেমন ইতিহাস, দর্শন – এগুলো হত একসাথে। তাই নিজের ইয়ারের অনেকের সাথেই অভির পরিচয় ছিল। বিশেষ করে যারা হোস্টেলে থাকত ওরা অভির ওখানে নিয়মিত আসত চা খেতে। অভি দেশ থেকে খাঁটি ইন্ডিয়ান বা বাংলাদেশী চা আর কফি পেত নিয়মিত। সেটাই ছিল এসব টি পার্টির মূল কারণ। দু এক বছর সিনিয়র বা জুনিয়রদের সাথে তেমন দহরম না থাকলেও পরিচয় ছিল। আসলে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ক্লাসের বাইরে বেশির ভাগ সময় নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিয়ে কাটাত বলে শতাধিক দেশের ছেলেমেয়েদের, তাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হবার অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অভি সেটা মিস করেছে। তবে নাস্তিয়া যখন একের পর এক বিভিন্ন নাম বলতে শুরু করল, ওদের মুখ মুহূর্তের মধ্যে ভেসে উঠলো অভির মানস চক্ষে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে কফির আড্ডা, একসাথে সিনেমা দেখতে যাওয়া কত কী! কথা বলতে বলতে ওরা দুজনেই ফিরে গেল গত শতাব্দীর আশির দশকে। কথা হল প্রিয় শিক্ষকদের নিয়ে। সময় যেন থমকে দাঁড়ালো। আর যখন সম্বিৎ ফিরল ওদের সামনে ঝলমল করে জ্বলতে লাগলো ইসাকিয়েভস্কি সাবরের উজ্জ্বল আলো।

Comments
Post a Comment