আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনা

 

অভি হাঁটছে গ্রিবয়েদভ কানালের পাশ দিয়ে। কানালের জলে রং বেরঙের ছবি ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ক্যামেরা বের করে পাগলের মত ছবি তুলতে থাকে। এই ক্যামেরাই একমাত্র বস্তু যার ভেতর দিয়ে তাকিয়ে অভি বাস্তবে ফিরে আসে। আসলে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় পড়ার এই এক সমস্যা। অংকের ফর্মুলা সব সময় মাথায় গিজগিজ করে। এর মধ্যে আবার যোগ হয়েছে উপন্যাসের চরিত্রগুলো। এমতাবস্থায় একমাত্র ক্যামেরাই ওকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু কনফারেন্সের শেষ রিপোর্টটা শেষ হতে না হতেই অভি বেরিয়ে পড়েছে ছবি তুলতে। নাস্তিয়ার আসতে এখনও অনেক দেরি। শেষ কফি ব্রেক ছিল সাড়ে চারটায়। কিছু একটা মুখে না তুললেই নয়। এখন চারিদিকে লেতনি ক্যাফে। শীতের দেশ। শীতে সব শুধুই ইনডোর। গ্রীষ্ম এলে অনেক ক্যাফেই বাইরে খোলা জায়গায় বসার ব্যবস্থা করে দেয়, আবার অনেকেই শুধুমাত্র গ্রীষ্মের সময়টাতেই হালকা খাবারের দোকান সাজিয়ে বসে। অভি ভাবল এরকম কোথাও গিয়ে চা আর স্যান্ডউইচ খাবে। হাঁটতে হাঁটতে এমন একটা ক্যাফেতে ঢুকতেই কে যেন অভির পিঠে আলতো করে টোকা দিল।    

-      চলুন আমাদের সাথে বসবেন।

অভি নিজের চোখকানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওঁকেই তো গতকাল ট্রেনে দেখেছে। আত্মভোলা মানুষ, ধুসর চোখ। তবে তাতে ভালবাসার অন্ত নেই।

-      আপনি?

-      গতকাল আমাদের ট্রেনে দেখা হয়েছে। তখনই ভেবেছি আলাপ করব। উপমহাদেশের লোকজন তো এদিকে খুব একটা দেখা যায় না!

-      আচ্ছা!

-      আসলে গতকালের দেখাও তো অপ্রত্যাশিত। আমি তো ভাবিইনি আবার কখনও আমাদের দেখা হবে। আবার যখন দেখা হলই তার মানে এটা কাকতালীয় ঘটনা নয়, এটা সুদবা,  ভাগ্য। তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু আলাপ করি।

-      আমি নিজেও গতকাল আপনার সাথে আলাপ করার কথা ভাবছিলাম। ভালই হল। একসাথে সময় কাটানো যাবে।

-      চলুন আমাদের টেবিলে।

ক্যাফের এক কোণে এক টেবিলে বসে ছিল গতকালের দেখা সেই লোকটি। ওর চোখ এখনও লাল। মনে হয় অনেকদিন ঘুমায়নি। পাশে বসা এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতী। টেবিলের পাশে এসে উনি অভির সাথে বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দিলেন

-   রাগঝিন, পারফেন। আমার বন্ধু। গতকাল ট্রেনে পরিচয়। আর ইনি আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনা। পিতেরের অন্যতম সুন্দরী।  
- আশ্চর্য!  আমি যার সাথে দেখা করতে এসেছি তার নামও নাস্তিয়া মানে আনাস্তাসিয়া।

আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনা কিছু না বলে মৃদু হেসে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। অভি আলতো করে চুমু খেলো সেই হাতে। রাগঝিন পাশ থেকে বললেন

-  আর আমাদের লেভ নিকোলায়েভিচ মিশকিন। এতদিন ইউরোপে ছিলেন। গতকাল মাত্র রাশিয়া ফিরে এসেছেন।

- খুব খুশি হলাম আপনাদের সাথে পরিচিত হয়ে। তা লেভ নিকোলায়েভিচ, আপনি কি আনাস্তাসিয়া ফিলিপভনার সাথে অনেক দিনের পরিচিত?  

- না। আজ সকালেই জেনারেলের বাসায় ওনার ছবি দেখছি। দেখেই ভালো লেগে গেছে। বলতে পারেন ভালবেসে ফেলেছি। অবাক হচ্ছেন তো?

- না না, অবাক হবার কি আছে!  আমি নিজেও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগে একটা ছবির প্রেমে পড়েছিলাম।

-  তারপর?  

- তারপর আর কি? সেই থেকে ভালোবেসেই যাচ্ছি।

- উনি আপনার স্ত্রী?

-  রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের নাম শুনেছেন? বাংলার সেরা লেখক। আপনাদের পুশকিনের মত। উনি কি বলেছেন জানেন? «যাকে ভালবাস তাকে কখনও বিয়ে করো না।»

-  তবে আপনাকে মানতেই হবে যে ভালবাসতে পারার মধ্যেই আসল মজা, এতেই সব সুখ, যেটা অন্যের ভালবাসা পাওয়ার মধ্যে সব সময় থাকে না।

-  যেমন?

-  দেখুন, মানুষ যখন অন্যকে ভালবাসতে পারে এর অর্থ তার হৃদয় এখনও মরে যায়নি। মনুষ্যত্বের ফল্গু ধারা এখনও তার মধ্যে বইছে।  আজ যখন চারিদিকে সব কিছু যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে, মানুষ সব কিছু ভুলে ছুটছে টাকা, যশ আর ক্ষমতার পেছনে, মানুষ পরিণত হচ্ছে রবোটে, তখন অন্যকে ভালবাসতে পারা কি একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে সুখের সংবাদ নয়?

অভি কী একটা বলতে যাচ্ছিল, তখনই ওয়েটার এসে জানতে চাইলো

       - আপনি কি কিছু অর্ডার দেবেন?

অভি আবিষ্কার করল টেবিলে সে একা বসে আছে। কখন যে তিন জন জলজ্যান্ত মানুষ হাওয়া হয়ে গেছে সে খেয়ালই করেনি!  অপ্রস্তুত অভি বলল

       - আমি বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি। এলেই আপনাকে জানাব। ধন্যবাদ। 



Comments

  1. বাহ, বিজন! তাই তো আমার বিশ্বাস বিজ্ঞান আর দর্শন একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। ভাল লাগল অনেক।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ মঞ্জু ভাই। আপনার কমেন্ট আমাকে উৎসাহ যোগাবে।

      Delete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ট্রেন টু সাঙ্কত পিতেরসবুরগ

স্তারেতস জশিমা

ইসাকিয়েভস্কি সাবর